প্রেম পিরিতির ২৮ টুকরা - ShomoyerDorpon

অপরাধ

প্রেম পিরিতির ২৮ টুকরা

বিশেষ প্রতিনিধি: যারা দুর্বলচিত্ত, যারা শিশু (১৮ বছরের নিচে বয়স) তাদের এ লেখা না পড়াই বাঞ্ছনীয়। ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে তিনটি অস্ত্র (আগ্নেয়াস্ত্র নয়) উদ্ধার করা হয়। একখান বঁটি, একটা চাপাতি এবং একটা ছুরি। এইগুলানের সাহায্যে কর্তন করা হয়েছে একটি নারী দেহ। দুর্ভাগা সেই তরুণীর বয়স ১৭। নিবাস গোপালগঞ্জ। মোবাইল ফোনে আলাপ হয়েছিল ঘাতকের সঙ্গে। মেয়েটিকে ২৮ টুকরা করে ঘৃণ্য পাশবিকতার নয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকার হাতিরপুলের পরিবাগ এলাকা। সেখানকার নাহার প্লাজায় একটি আবাসিক হোটেল ও পাশের ভবনের ছাদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল খ িত দেহাংশগুলো। ছিল অকুস্থলেও। নৃশংসভাবে খুন করার আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। খুনি বাচ্চু বলেছে, ধর্ষণের ব্যাপারটি সবাইকে বলে দেব—মেয়েটি এই হুমকি দিয়েছিল। সে জন্য খুন করি ওকে।

১৮, পরিবাগের পাঁচতলা ভবনের ছাদে দেখা গেছে ময়লা-আবর্জনা ও ফেনসিডিলের বোতল। ভবনটি নাহার প্লাজার লাগোয়া। লাশের ১৪ খান টুকরা সেই ছাদে ছড়ানো ছিটানো। বুকের পাঁজর পড়ে ছিল দেয়ালের কাছে। দুই গজ দূরে কর্তিত মস্তক। চুল কেটে ছোট করা হয়েছে। ডান হাতের পাঞ্জা পড়ে ছিল ছাদের মাঝখানটায়। এক গজ দূরে পা, অল্প দূরত্বে পায়ের পাতা ও হাত। মাথার চুল ছড়ানো ছিল ছাদ জুড়ে। ছাদ থেকে উদ্ধার করা টুকরোর সংখ্যা ১৪। নাহার প্লাজায় অবস্থিত স্কাই গার্ডেন হোটেলের ১২০৯ নম্বর কক্ষ থেকে পাওয়া যায় বাকি ১৪ টুকরা। হায় রে প্রেম!

খুনি বাচ্চু জানিয়েছে, মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গোপালগঞ্জ থেকে ও ঢাকায় এসেছিল সম্প্রতি। নাহার প্লাজার ১৩ তলায় সোনালি ট্রাভেলস অফিসে নিয়ে যায় সে। এক পর্যায়ে মেয়েটিকে গলা টিপে মেরে ফেলে। তারপর লাশ গুম করে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ধারালো ছুরি, বঁটি ও চাপাতি দিয়ে মাথা থেকে শরীর কেটে বিচ্ছিন্ন করে প্রথমে। তারপর মাথার চুল কর্তন। শরীর টুকরা টুকরা করা হলো। হাড় থেকে মাংস আলাদা করা হয়। কমোডে মাংস ফেলে দিয়ে ঢালা হয় পানি। নিচতলার কক্ষের কমোডে রক্তমেশানো পানি ও মাংসের টুকরা দেখা যায়। জানালা দিয়ে দেহের বিভিন্ন অংশ ছুঁড়ে ফেলে দেয় মানুষরূপী এই শয়তান।

দু’বছর আগে মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এক বছর আগে ওকে সে মোবাইল ফোন কিনে দেয়। তারপর কথা চলতে থাকে। বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা। প্রেমিকের (?) হাতে মরবার জন্যই ঢাকায় আসতে হয়েছিল তাকে। ঘাতকের সঙ্গে মেয়েটি যখন নাহার প্লাজার নিচ থেকে ওপরে উঠছিল, তখন কতিপয় মাস্তান পিছু নেয় তাদের। খুনি বাচ্চু সোনালি ট্র্যাভেলসের ম্যানেজার। তার আবাসও সেখানে। অফিস কক্ষে ঢোকার পর মাস্তানরা তাদের দরজা আটকে দেয় বাইরে থেকে। এক কামড়ে মে বন্দ হো! দরজার ওপাশে থাকা লোকজন বলে, বাইরে বেরুলেই দু’জনকে বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হবে।

নিহত মেয়েটির বাবা নেই। খুবই দরিদ্র পরিবার তাদের। তিন বোনের মধ্যে সে ছোট। বড় দুই বোন ঢাকার একটি বস্তিতে থাকে। কাজ করে পোশাক তৈরির কারখানায়। হতভাগিনী এই তরুণীও একটি গার্মেন্টে কাজ নিয়েছিল। মেয়েটির মা ও বোনেরা খ -বিখ লাশ নেননি। সন্তানহারা মা পুলিশকে বলেছেন, ‘লাশ চাই, অক্ষত লাশ। যা পাওয়া গেছে তা তো লাশ নয়। কয়েক টুকরো মাংস আর হাড়। এখন এগুলো বুঝে নিয়ে আমি কি করব? যে নরপশু আমার মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করেছে, আমি তার ফাঁসি চাই। তাকেও যেন কেটে টুকরো টুকরো করা হয়।’ পুলিশ লাশটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আঞ্জুমান বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে থাকে।

মেয়েটিকে যে খুন করা হলো, তার বিচার কী শেষতক হবে? নাকি বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে? খুব দ্রুতই লোকজন ভুলে যাবে এই নৃশংস হত্যাকাপে নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করে ফেলার ঘটনা। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকা ের প্রসঙ্গ। বিচারের দায় কে নেবে? এমন ঠেকা পড়েছে কার? কেনই বা নেবে? মেয়েটি খুন হয়েছে বেডরুমে। ঘাতক বাচ্চুর আস্তানা ছিল ওই ট্র্যাভেলসের অফিসটাই। সেটাই তার বেডরুম। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই বলেছিলেন, বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি অধিক জোরালো—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি গত দশ বছরের মধ্যে ভালো। বাহা রে বাহা। অমন কথা শুনলে আমরা টাসকি খেয়ে যাই কাহা (কাকা)। আহা রে আহা।

আমাদের তো মনে হয়, গণতন্ত্রকেই বঁটি দিয়ে কোপানো হচ্ছে। বঁটিকে জাতীয় অস্ত্র হিসেবে ঘোষণারও আবদার জানিয়ে রাখি এই মওকায়। কেটেকুটে ফানাফানা করা গণতন্ত্রের লাশ কোথায় যে গুম করা হবে, আল্লা মালুম। গুম আদৌ করা যাবে কিনা, তাও সন্দেহ। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। রাষ্ট্রের অবস্থা ভয়ঙ্কর। এ পক্ষ ওই পক্ষকে দুষছে। কামড়াতে চাইছে। দিচ্ছে রণহুঙ্কার। কখন যে ৮ মাত্রার ভূকম্পন হয়ে যায়, তা জানেন একমাত্র পরওয়ারদিগার। আমরা নিহত তরুণীটির জন্য, তার শোকাহত পরিবারের জন্য একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে পারি মাত্র। এছাড়া করার কিছুই নাই। আসলেই কী নাই?

No comments


Leave a Reply